ইসলাম

শবে কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য

ইসলামে শবে কদর (লাইলাতুল কদর) হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাত আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমত, বরকত ও গুনাহ মাফের বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে।শবে কদরের ফজিলত ও তাৎপর্যকুরআনে এবং হাদিসে শবে কদরের অসাধারণ গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই রাতে আল্লাহর অসংখ্য রহমত বর্ষিত হয়, ফেরেশতারা দুনিয়াতে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের জন্য কল্যাণের ব্যবস্থা করেন।

তাই শবে কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য বুঝে আমরা যদি যথাযথ ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রাতটি কাটাই, তবে আমাদের জন্য তা পরকালীন মুক্তির বড় মাধ্যম হতে পারে।

শবে কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য?

শবে কদর (লাইলাতুল কদর) হলো ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। এটি রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি, বিশেষ করে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯তম রাতে হয়ে থাকে।

তবে বেশিরভাগ উলামায়ে কেরাম ২৭তম রাতকেই সম্ভাব্য শবে কদর হিসেবে গণ্য করেন। নিচে শবে কদরের ফজিলত তুলে ধরা হলোঃ

১. হাজার মাসের চেয়েও উত্তম

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেনঃ “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সুরা আল-কদর: ৩)। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের সমান সওয়াব বহন করে।

২. কুরআন নাজিলের রাত

এই রাতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ ও রহমত। (সুরা আল-কদর: ১)

৩. ফেরেশতাদের অবতরণ

এই রাতে ফেরেশতারা এবং বিশেষত প্রধান ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর হুকুমে দুনিয়ায় অবতরণ করেন এবং মুমিনদের জন্য দোয়া করেন। (সুরা আল-কদর: ৪)

৪. গুনাহ মাফের সুযোগ

রাসূল (সা.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি শবে কদরের রাতে ঈমান ও সওয়াবের আশায় ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৪)

৫. শান্তি ও রহমতের রাত

এটি সারারাত শান্তি ও রহমতের রাত, যা ফজর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। (সুরা আল-কদর: ৫)

কিভাবে শবে কদর কাটাবেন?

১. নফল নামাজ পড়া

যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ পড়া উচিত।

২. কুরআন তিলাওয়াত করা

কুরআন বুঝে পড়া এবং তাফসির অধ্যয়ন করা।

৩. দোয়া ও ইস্তিগফার করা

আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও প্রিয়জনদের জন্য দোয়া করা।

৪. দরুদ শরিফ পাঠ করা

বেশি বেশি রাসুল (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা।

৫. সদকা করা

গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করা।

বিশেষ দোয়া

হজরত আয়েশা (রা.) রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি জানতে পারি যে, এটি লাইলাতুল কদর, তাহলে কী দোয়া পড়ব?” রাসূল (সা.) বলেছেনঃ
اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني

“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।”

(হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে ভালোবাসো, তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও।) (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)

শবে কদরের পূর্ণ ফজিলত পেতে হলে আমাদের উচিত এই রাতকে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটানো এবং আল্লাহর রহমত লাভের চেষ্টা করা।

আরও পড়ুনঃ শবে কদরে করণীয় ও বর্জনীয়

শবে কদরের রাতে করণীয় ইবাদত?

শবে কদরের পূর্ণ ফজিলত অর্জন করতে হলে এই রাতে যত বেশি সম্ভব ইবাদত করা উচিত।

১. নফল নামাজ

  • ২, ৪, ৬, ৮, ১০ বা তার বেশি রাকাত নফল নামাজ পড়া যেতে পারে।
  • প্রতি দুই রাকাত পরপর দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত।

২. কুরআন তিলাওয়াত

  • যত বেশি সম্ভব কুরআন তিলাওয়াত করা।
  • সুরা কদর, সুরা ইয়াসিন, সুরা রহমান, সুরা মুলক, সুরা ইখলাস ইত্যাদি পড়া যেতে পারে।

৩. তাওবা ও ইস্তিগফার

নিজের ও পরিবারের পাপমুক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।

বিশেষ দোয়াঃ

اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني

“হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করাকে ভালোবাসো, তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও।” (তিরমিজি: ৩৫১৩)

৪. দরুদ শরিফ পাঠ

  • বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
  • “দরুদ ইব্রাহিমি” অথবা সংক্ষিপ্ত দরুদ পড়া যেতে পারে।

৫. দোয়া করা

  • নিজের, পরিবারের, মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা।
  • অসুস্থদের সুস্থতা, গুনাহ মাফ, জীবনের কল্যাণ, জান্নাতের কামনা ইত্যাদি করা।

৬. দান-সদকা করা

  • গরিব ও অসহায়দের সাহায্য করা।
  • মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করা।
  • এতিম, বিধবা ও অসহায়দের সহায়তা করা।

আরও পড়ুনঃ শবে কদরের নামাজ কোন সূরা দিয়ে পড়তে হয়

শবে কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস?

১. রাসূল (সা.) বলেনঃ “শবে কদরকে রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে তালাশ করো।” (বুখারি, মুসলিম)।

২. রাসূল (সা.) বলেনঃ “যে ব্যক্তি শবে কদরের রাতের ইবাদত করবে, তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে।” (বুখারি, মুসলিম)।

৩. হজরত আয়েশা (রা.) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি শবে কদর পাই, তাহলে কী দোয়া পড়ব?”
রাসূল (সা.) বললেনঃ

“اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني” (তিরমিজি)

শেষ কথা

শবে কদর অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় রাত। এটি পাওয়ার জন্য আমাদের উচিত রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতে ইবাদতে মশগুল থাকা। বেশি বেশি নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, তাওবা, ইস্তিগফার ও দান-সদকা করা।

এই রাতের ইবাদত আমাদের জীবন পরিবর্তন করে দিতে পারে। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে শবে কদরের ফজিলত অর্জন করার তাওফিক দান করেন, আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button